নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা বোয়ালিয়া খাল এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলার শিকার হয়েছেন র্যাব-১১-এর সদস্যরা। এই ঘটনায় তিন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে ইসদাইর, মাসদাইর ও গলাচিপা কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী মাদক নেটওয়ার্ক, যারা পুরো শহরকে মাদকের মরণফাঁদে পরিণত করেছে।
রক্তাক্ত দুপুর: র্যাবের ওপর বর্বরোচিত হামলা
মঙ্গলবার দুপুরে বোয়ালিয়া খাল এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ধরতে ও মাদক উদ্ধারে অভিযানে নামে র্যাব। এসময় মাদক ব্যবসায়ীদের একটি সশস্ত্র বাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের কোপে আহত হন তিন র্যাব সদস্য। আহতদের মধ্যে মাহী ও ইব্রাহীমকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও, মাথায় ও শরীরে গুরুতর জখম থাকা এসআই নজিবুলকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর র্যাব-১১-এর অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং অপরাধীদের ধরতে চিরুনি অভিযান শুরু করেন।
গলাচিপার ক্ষমতার রদবদল: বন্দুক শাহীন থেকে মাসুদের 'ইমন বাহিনী'
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গলাচিপা বোয়ালিয়া খাল এলাকার মাদক ও অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ সাম্প্রতিক সময়ে হাতবদল হয়েছে।
অতীতের নিয়ন্ত্রণ: এক সময় এই এলাকা দাপিয়ে বেড়াত কুখ্যাত 'বন্দুক শাহীন' ও তার বাহিনী।
বর্তমান নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে এই এলাকার পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে মাসুদ এবং তার দুর্ধর্ষ 'ইমন বাহিনী'। অভিযোগ রয়েছে, এই ইমন বাহিনীর সদস্যরাই মূলত আজকের হামলায় অগ্রভাগে ছিল। মাদক ব্যবসার আধিপত্য ধরে রাখতে তারা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
ইসদাইর-গলাচিপা 'মেগা সিন্ডিকেট': একই সুতোয় গাঁথা অপরাধ
তদন্তে উঠে এসেছে, গলাচিপার মাসুদের বাহিনীর সাথে ইসদাইর ও ওসমানী পৌর স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকার মাদক সিন্ডিকেটের গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
সিন্ডিকেটের মূল বিন্যাস:
নেপথ্যে মাদক সম্রাজ্ঞী: নারায়ণগঞ্জের কথিত মাদক সম্রাজ্ঞী সিমা সরাসরি মাদক সরবরাহ করেন ইসদাইর এলাকার বিলকিসকে (পিতা: হারুন)।
মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক: বিলকিসের সৎ ভাই সাকিল এবং স্বামী জাহিদ চিকার বাড়ি মাঠ এলাকায় ইয়াবা ও হিরোইনের রমরমা ব্যবসা চালান। সাকিলের ইয়াবা সিন্ডিকেটে দৈনিক ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকার লেনদেন হয় বলে জানা গেছে।
অস্ত্রের শক্তি: এই পুরো সিন্ডিকেটের (মাসুদ-ইমন বাহিনী ও সাকিল-জাহিদ বাহিনী) কাছে রয়েছে পিস্তলসহ ভয়ংকর দেশীয় অস্ত্র। তারা মূলত একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
খুনের মামলার আসামি যখন প্রকাশ্য রাজপথে
এই মাদক বাহিনীর নৃশংসতা কেবল মাদক ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে:
রায়হান হত্যা (১২/০১/২০২৬): সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রায়হানকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এই চক্রের শীর্ষ সদস্যদের নাম রয়েছে।
রাজমিস্ত্রি রুবেল হত্যা (২০২২): এই হত্যাকাণ্ডেও তাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর আর্তনাদ: "খুনের মামলা কাঁধে নিয়েও তারা এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এখন তো তারা প্রশাসনের ওপরও হামলা করতে দ্বিধা করছে না। আমরা সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে আছি।"
প্রশাসনের কঠোর বার্র্তা
র্যাবের ওপর হামলার পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধুমাত্র গলাচিপা নয়, এই সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটন করতে হলে ইসদাইর, মাসদাইর ও চিকার বাড়ি মাঠ এলাকায় একযোগে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। অন্যথায়, এই সশস্ত্র মাদক বাহিনী নারায়ণগঞ্জ শহরের শান্তিশৃঙ্খলা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে।
বর্তমানে পুরো এলাকায় অতিরিক্ত র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বড় ধরনের গ্রেফতারি অভিযানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে এলাকাবাসী।